রাশিয়ায় বেড়েই চলেছে খাদ্যপণ্যের দাম

যুদ্ধের প্রভাবে সঞ্চয় ভাঙছে সাধারণ মানুষ

রাশিয়ার অর্থনীতি এখন এক কঠিন সময় পার করছে। ইউক্রেন যুদ্ধের চার বছর হতে চলল।

এ সময়ে সাধারণ রুশ নাগরিকরা দৈনন্দিন জীবনে যুদ্ধের আর্থিক প্রভাব সরাসরি অনুভব করছেন। বাজারে প্রায় প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রাশিয়ার অর্থনীতি এখন স্থবির হয়ে পড়েছে এবং এটি মন্দার দিকে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। খবর বিবিসি।

রাশিয়ার সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা রোজস্ট্যাটের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশটিতে খাদ্যদ্রব্যের দাম সামগ্রিকভাবে বেড়েছে ১৮ দশমিক ১ শতাংশ। তবে বাজারের সাম্প্রতিক চিত্র আরো দ্রুত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে রাশিয়ার সুপারমার্কেটগুলোয় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম গড়ে বেড়েছে ২ দশমিক ৩ শতাংশ।

বিবিসি কয়েক বছর ধরে রাশিয়ার বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করছে। ২০১৯ সাল থেকে তারা মস্কোর একটি জনপ্রিয় সুপারমার্কেট চেইন থেকে ৫৯টি মৌলিক পণ্যের একটি তালিকা বা বাস্কেট নিয়মিত ক্রয় করে আসছে। এ তালিকায় দুধ, মাংসের মতো খাদ্যদ্রব্য থেকে শুরু করে সাবান ও টুথপেস্টের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যও রয়েছে।

বিবিসির এ দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণের ফলাফল তথ্যানুযায়ী, গত দুই বছরে এ ৫৯টি পণ্যের সামগ্রিক দাম বেড়েছে ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে যে পণ্যগুলো কিনতে ৭ হাজার ৩৫৮ রুবল লাগত, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সে একই পণ্য কিনতে খরচ হচ্ছে ৮ হাজার ৭২৪ রুবল। বর্তমানে মাংস, আটা, সবজি এবং ওষুধের মতো প্রায় প্রতিটি মৌলিক পণ্যের দামই ঊর্ধ্বমুখী।

খাদ্যপণ্যের মধ্যে দুগ্ধজাত পণ্যের দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। গত দুই বছরে এ খাতের পণ্যগুলোর দাম বেড়েছে ৪১ শতাংশ। মূলত খামারের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, ব্যাংকের ঋণের উচ্চ সুদ এবং শ্রমিক সংকটে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে, রাশিয়াকে ফল ও সবজির জন্য আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। রুবলের বিনিময় হারের ওঠানামা এবং পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় ২০২৪ সাল থেকে এগুলোর দাম বেড়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ।

রাশিয়ার বর্তমান জাতীয় বাজেট মূলত যুদ্ধ ও প্রতিরক্ষা খাতের ওপর নির্ভরশীল। এ বিশাল ব্যয় সামাল দিতে ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ভ্যাট ২০ থেকে বাড়িয়ে ২২ শতাংশ করা হয়েছে। রাশিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, দেশের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ বাড়তি কর প্রয়োজন ছিল। ভ্যাট বৃদ্ধির ফলে বাজারে প্রতিটি পণ্যের দাম আরো এক দফা বেড়েছে।

মস্কোর সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ—সবার জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন এসেছে। অনেকে এখন দৈনন্দিন খাবারের খরচ মেটাতে বাধ্য হয়ে জমানো টাকা বা সঞ্চয় ভাঙছেন। মানুষের খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন এসেছে; দামি প্রোটিন বা গরুর মাংসের বদলে মানুষ এখন সস্তা মাছ বা বিকল্প খাবারের দিকে ঝুঁকছে। অনেকের জন্য রেস্টুরেন্টে খাওয়া বা নতুন পোশাক কেনা এখন বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সাল থেকে রাশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে আসায় মানুষের বেতন আর ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছে না।

অর্থনীতিবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমে গেলে এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার বাজেট ঘাটতি আরো বাড়তে পারে। জ্বালানি তেলের বাজারে দরপতন রাশিয়ার অর্থনীতিকে বড় ধরনের মন্দার মুখে ফেলার ঝুঁকি তৈরি করছে।

বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশটির অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতার দিকে যাচ্ছে। যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে গিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ বাড়ার এ ধারা অদূর ভবিষ্যতে কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

আরও